দিনাজপুর পঞ্চদশ শতকের রাজবাড়ি|

421

বাংলাদেশের ইতিহাস ঐতিহ্য আর অন্যতম একটি অংশ রাজবাড়ি। বাংলার প্রায় প্রতিটি জেলা শহরেই বিভিন্ন সময়কার রাজাদের নিদর্শন সম্বলিত রাজ বাড়ি গুলো এখন সগৌরবে দাড়িয়ে আছে। তাদের মধ্যে অন্যতম একটি হল দিনাজপুর জেলার রাজবাড়ি।

দিনাজপুরে রাজবাড়ি রাজা দিনাজ স্থাপন করেন কিন্তু অনেকের মতে পঞ্চদশ শতকের প্রথমার্ধে ইলিয়াস শাহীর শাসনামলে সুপরিচিত রাজা গনেশ এই বাড়ীর স্থপতি। সপ্তাদশ  শতাব্দীর শেষের দিকে শ্রীমন্ত দত্ত চৌধুরী দিনাজপুরের জমিদার হন। কিন্তু শ্রীমন্ত দত্ত চৌধুরীর ছেলের অকাল মৃতুতে তার ভাগ্নে সুখদেব ঘোস তার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন। ১৬০৮ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত রাজবাড়িটি ছিল বৃহৎ দিনাজপুর জেলার ঐশ্বর্যের প্রতিক। শুরুর দিকে রাজবাড়ির অবয়ব এমন না হলেও ধীরে ধীরে রাজবাড়ি গড়ে উঠে তিলত্তমা হিসেবে। ১৯৫১ সালে জমিদারী অধিগ্রহণ বা প্রজাস্বস্ত আইন বাস্তবায়নের ফলে জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ হয়। তখন হতে রাজবাড়িটি পরিত্যাক্ত হতে শুরু করে এবং জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের পর হতে রাজবাড়ি  জৌলুস কমতে থাকে।

রাজবাড়ির প্রায় ১৬৬ একর বা ৬৭ হেক্টর জায়গা জুড়ে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল বিশাল প্রসাদ। যার মধ্যে রয়েছিল আয়না মহল, রাণী মহল ও ঠাকুরবাড়ী মহল। এ ছাড়াও ফুলবাগান, হীরাবাগ, সবজিবাগ, পিলবাগ, দাতব্যচিকিৎসা, অতিথি ভবন, কর্মচারীদের আবাসিক এলাকা, প্রশাসনিক ভবন ও প্রসাদের মধ্যে কয়েটি বিরাট দীঘি রয়েছে। দ্বিতল আয়না মহলে নিচে উপরে মিলে ২২টি করে মোট ৪৪টি কক্ষ রয়েছে।  এই ভবনের মূল্যবান মার্বেল পাথর ও স্টটিকমতি খচিত ছিল। এছাড়াও রাজপ্রাসাদ এলাকায় জলসাগর, তোষাখানা, পাঠাগার সহ প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভবন এই মহলে অবস্থিত। আয়না মহলে উত্তরে রাণীর দেউড়ি পেরিয়ে রাণী মহল অবস্থিত ছিল।

এ সকল দালান-কোঠা এবং পূর্ব ও দক্ষিণের দুটি বৃহৎ দিঘি, পরিখা, বাগান, একটি বিলুপ্ত চিড়িয়াখানা, একটি টেনিস কোর্ট, কাচারি ও কুমার হাউসসহ রাজবাড়িটি প্রায় ১৬.৪১ একর এলাকা নিয়ে বিস্তৃত। মূল মহল ও এর সংলগ্ন পরিখা সম্ভবত আঠারো শতকে মহারাজা প্রাণনাথ ও তাঁর পোষ্যপুত্র রামনাথ নির্মাণ করেছিলেন। প্রাসাদটি নির্মিত হয়েছিল ইউরোপীয়, মুসলিম ও হিন্দু রীতির এক অদ্ভুত সংমিশ্রণে, যা খুব একটা দৃষ্টিনন্দন হয় নি। রামডাঙ্গা নামক দুটি সমান্তরাল পরিখা প্রাসাদটি ঘিরে ছিল। পরিখাটি সম্ভবত আলীবর্দী খান এর শাসনামলে রংপুরের ফৌজদার সৈয়দ আহমেদ খানের আক্রমণের পরই রামনাথ খনন করিয়েছিলেন।

আসলে বর্তমানে দিনাজপুর রাজবাড়ি বলতে এর অবশিষ্টকে বুঝায়। এ বেশিরভাগ অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। শুধু গুটিকয়েক স্থাপনা এখন বিদ্যমান। রাজবাড়ির প্রবেশপথে পশ্চিমমূখী একটি মিনার আকৃতির বিশাল ত্রৌরণ আছে। রাজবাড়ির সীমানার মধ্যে ত্রৌরণ আছে যার মধ্যে রাজবাড়ির প্রধান বর্গকার অংশে প্রবেশ করা হয়। রাজবাড়ির প্রধান অংশের পূর্বদিকে আর একটি সমতল ছাদবিশিষ্ট মন্দির আছে। যার মধ্যে অনেক হিন্দু দেব-দেবতার প্রতিমা বিদ্যমান।

কিভাবে যাওয়া যায়:

দিনাজপুর রাজবাড়ী দিনাজপুর শহরের উত্তর-পশ্চিম দিকে ফুলবাড়ী বাসস্ট্যান্ড মোড় হতে পঞ্চগড় ঠাকুরগাওগামী মহাসড়কের চিরিরবন্দর সংযোগ সড়কের মোড় হতে ১ কিঃমিঃ অটোরিকশা যোগে।