চন্দ্রাবতী মন্দির

666

কিশোরগঞ্জ মধ্যযুগের বাংলা সংস্কৃতির রাজধানী। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর আর সমতলের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা প্রাচীন জনপদ কিশোরগঞ্জের এখানে-সেখানে ছড়িয়ে আছে শিল্প-সংস্কৃতির নানা নিদর্শন। ষোড়শ শতকের মনসা মঙ্গলের বিখ্যাত কবি দ্বিজ বংশীদাসের কন্যা ও বঙ্গের আদি মহিলা কবিরূপে খ্যাত চন্দ্রাবতী বাংলা সাহিত্যের একজন সার্থক ট্রাজিক নায়িকা হিসাবে কিংবদন্তী হয়ে রয়েছেন। তার নাম অনুসারেই কিশোরগঞ্জ জেলায় অবস্থিত চন্দ্রাবতী মন্দির।

প্রকৃতপক্ষে মন্দিরটি একটি শিব মন্দির। ধারনা করা হয়ে থাকে যে এই মন্দিরগুলো ১৬শ শতকে নির্মাণ করা হয়েছিল। কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলাধীন মাইজখাপন ইউনিয়নের কাচারীপাড়া গ্রামে ফুলেশ্বরী নদীর তীরে শিবমন্দিরটির অবস্থান। চন্দ্রাবতী মন্দির বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর কর্তৃক তালিকাভুক্ত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা।

প্রচলিত ধারণা মতে, জয়ানন্দ নামের এক যুবকের সাথে চন্দ্রাবতীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। শৈশব থেকেই এই সম্পর্ক চলে আসছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই জয়ানন্দ অন্য আরেকজন মুসলিম তরুনীর প্রেমে পড়ে যান। পরে সে ধর্মান্তরিত হয়ে সেই মুসলিম তরুণীকে বিয়ে করে। এতে ভীষণ আঘাত পান কবি চন্দ্রাবতী। ভেঙে পড়তে থাকেন তিনি। নিজের ভুল বুঝতে পেরে জয়ানন্দ ফিরে এলেও চন্দ্রাবতী থাকে ফিরিয়ে দেন। এ ঘটনার পর জয়ানন্দ ফিরে না গিয়ে ফুলেশ্বরী নদীতে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বিসর্জন দেন। এতে আরও বেশি বিচলিত হয়ে পড়েন চন্দ্রাবতী। এ সময় মেয়ের দুঃখে কবির বাবা দ্বিজ বংশীদাসও চিন্তিত হয়ে পড়েন। বহু কষ্টের পর বাবার কাছে দুটি ইচ্ছা প্রকাশ করেন তিনি। একটি হচ্ছে ফুলেশ্বরী নদী তীরে মন্দিরপ্রতিষ্ঠা। অন্যটি চিরকুমারী থাকার ইচ্ছা। এরপরেই চন্দ্রাবতী রামায়ণ রচনায় মনোনিবেশ করেন। তার ইচ্ছাতেই ফুলেশ্বরী নদীর তীরে শিবমন্দিরটি স্থাপন করা হয়।

চন্দ্রাবতী মন্দিরিটি আকৃতিতে অষ্টভুজাকৃতির। মন্দিরের উচ্চতা প্রায় ৩২ ফুট। এর আত বাহুর প্রতিটির দৈর্ঘ্য ৮ ফুট। মন্দিরের নিচতলায় আছে একটি কক্ষ ও তাতে প্রবেশের পথ। কক্ষের ভেতরে রয়েছে ৭টি কুলুঙ্গি। মন্দিরের দ্বিতীয় তলাতে আছে একটি প্রশস্ত কুলুঙ্গি এবং পোড়ামাটির সুদৃশ্য কাজ। দ্বিতীয় তলা থেকেই মন্দিরটি ক্রমশ সরু হয়ে ৩২ ফুট পর্যন্ত উচ্চতায় গিয়ে শেষ হয়েছে। এর চূড়ায় রয়েছে ১৯৯০ এর দশকে প্রত্নতত্ত্ব মন্দিরটির কিছু অংশ সংস্কার করে।

বর্তমানে ফুলেশ্বরী নদীর চিহ্ন না থাকলেও কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে ঐতিহাসিক শিব মন্দির। দেশ-বিদেশের নানা স্থান থেকে দর্শনার্থীরা ঐতিহাসিক শিব মন্দির দেখতে ছুটে আসেন।

কিভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে ঈশা খাঁ বাস সার্ভিস, বিআরটিসি বাসসহ কয়েকটি পরিবহন বাসে যেতে হবে কিশোরগঞ্জ। ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। সেখান থেকে রিকশা বা ইজিবাইকে ১০ থেকে ২০ টাকা ভাড়ায় সহজেই পৌঁছা যাবে চন্দ্রাবতী শিবমন্দির।